রবিবার, ২৬ জানুয়ারি, ২০২৫

নিউটাউন সোসাইটির উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল পিঠা উৎসব ২০২৫

আজ ২৬ জানুয়ারি ২০২৫ রোজ রোববার সমাপ্তি হলো নিউটাউন সোসাইটির উদ্যোগে আয়োজিত ২ দিন ব্যাপী জমজমাটপূর্ণ পিঠা উৎসব। রাজধানী ঢাকার নিউটাউন আবাসিক এলাকার ইউনিক টাওয়ার মাঠে আয়োজন ছিল এই উৎসবের। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন নিউটাউন সোসাইটির সম্মানিত আহবায়ক জনাব নেসার উদ্দিন, সদস্য সচিব জনাব আবু জাফরসহ সোসাইটির অন্যান্য সদস্যবৃন্দ।

সমাপ্তি অনুষ্ঠানে বক্তব্য প্রদান করেন আহবায়ক ও সদস্য সচিবসহ যুগ্মআহবায়ক জনাব মোতাসিম বিল্লাহ, সদস্য জনাব পারভেজ অনিক, সদস্য ডাঃ দেলোয়ার জাহান ইমরান, পিঠা উৎসব ২০২৫ কমিটির সম্মানিত আহবায়ক জনাব জিন্নাতুল ইসলাম, সহ-আহবায়ক জনাব নাজমুল হাসানসহ আরো অনেকেই।
নিউটাউন সোসাইটি পিঠা উৎসব ২০২৫
এছাড়াও বক্তব্য রাখেন পিঠা উৎসব ২০২৫ এ স্টল নিয়েছেন এমন বেশ কয়েকজন উদ্যোক্তা। বিকাল ৩ ঘটিকা থেকে রাত ৯ ঘটিকা ব্যাপী পিঠা উৎসবের সময়সূচি থাকলেও সমাপ্তির নির্ধারিত সময়ের ২ ঘন্টা পূর্বেই বহু স্টলের পিঠা বিক্রি শেষ হয়ে যায় এবং কিছু কিছু স্টলে পিঠা রিফিল করার পর সেগুলিও শেষ হয়ে যায়। নিউটাউন সোসাইটির উদ্যোগে আয়োজিত পিঠা উৎসবকে ঘিরে এই বিষয়টি সর্বাধিক আলোচিত ছিলো।
নিউটাউন সোসাইটি পিঠা উৎসব ২০২৫
নিউটাউন সোসাইটি পিঠা উৎসব ২০২৫
নিউটাউন সোসাইটি পিঠা উৎসব ২০২৫
অনেক উদ্যোক্তা পিঠা উৎসবের ব্যাপ্তি কাল দুই দিন থেকে বাড়িয়ে পাঁচ দিন করারও পরামর্শ দেন। কিন্তু সঙ্গত কারণে সময় বর্ধিত করা সম্ভব হয়নি তবে বছরে কোন না কোন ইভেন্ট উপলক্ষ্যে এই রকম উৎসব আয়োজনের মাধ্যমে তরুন উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করার পরামর্শ দেন সোসাইটির কোন কোন সদস্য। 
Read More...

বুধবার, ২২ জানুয়ারি, ২০২৫

নামজারি বা মিউটেশন কি ? নামজারি কেন জরুরি ?

নামজারি করা কি জরুরী, নামজারী না করলে কি সমস্যা হয় ইত্যাদি কমন কয়েকটি প্রশ্ন প্রায়ই আসে। অনেকেই আবার চিরাচরিত ভাবে বলে থাকেন নামজারি বা মিউটেশন না করলেও কিছু হয় না। বিষয়টি কিন্তু সত্য নয়। আমরা বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করছিঃ-

নামজারি বা মিউটেশন হচ্ছে জমিসংক্রান্ত বিষয়ে মালিকানা পরিবর্তন করা। কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কোন বৈধ পন্থায় ভূমি/জমির মালিকানা অর্জন করলে সরকারি রেকর্ড সংশোধন করে তার নামে রেকর্ড আপটুডেট (হালনাগাদ) করাকেই নামজারি বলা হয়। 

কোন ব্যক্তির নামজারি সম্পন্ন হলে তাকে একটি খতিয়ান দেয়া হয় যেখানে তার অর্জিত জমির একখানি সংক্ষিপ্ত হিসাব বিবরণী উল্লেখ থাকে। উক্ত হিসাব বিবরণী অর্থাৎ খতিয়ানে মালিকের নাম, কোন মৌজা, মৌজার নম্বর (জেএল নম্বর), জমির দাগ নম্বর, দাগে জমির পরিমাণ, একাধিক মালিক হলে তাদের নির্ধারিত হিস্যা ও প্রতি বছরের ধার্যকৃত খাজনা (ভূমি উন্নয়ন কর) ইত্যাদি লিপিবদ্ধ থাকে।
নামজারি বা মিউটেশন

নামজারি কেন জরুরি ?

১. নামজারি না থাকলে ভয়াবহ সমস্যা হতে পারে। আপনার নামজারি না থাকায় বিক্রেতা জমিটি পুনরায় প্রভাবশালী বা কারো কাছে বিক্রি করে দিতে পারেন অনায়াসে। ফলতঃ প্রভাবশালী বা কারো দ্বারা বেদখল হয়ে যেতে পারেন যেকোন মুহূর্তে।

২. সরকার যদি কোন জনস্বার্থ জনিত কারণে জমিটি অধিগ্রহণ করেন, সেক্ষেত্রে ক্ষতিপূরন যার নামে সর্বশেষ রেকর্ড বা নামজারি খতিয়ান, তার নামে আসবে বা চতুর বিক্রেতা ক্ষতিপূরণের টাকা তুলে নিতে পারেন। আপনি অহেতুক টাকা উদ্ধারের জন্য মামলা-মোকদ্দমায় জড়িয়ে পড়বেন এবং জীবন দূর্বিষহ হয়ে যাবে।

৩. হটাৎ যদি কোন কারণে বিক্রেতা কর্তৃক বা কোন ওয়ারীশী ঝামেলা থাকলে কারো দ্বারা বেদখল হোন, বা দাগের বা বড় দাগের একাধিক মালিক, আপনি অংশবিশেষ কিনেছেন এক্ষেত্রে নামজারি না থাকায় আপনি স্বীয় দখল প্রমাণ করতে সমস্যায় পড়বেন ইত্যাদি।

৪. কোন কারণে দখল প্রমাণের প্রয়োজন হলো, নামজারি না থাকায় দখল প্রমাণ করতে ঝামেলায় পড়তে পারেন।

৫. হেবার অন্যতম শর্ত হলো তাৎক্ষণিকভাবে দখল হস্তান্তর করা। হেবা নিয়ে কোন প্রশ্ন উঠলে দখল হস্তান্তর ও দখল প্রমাণ করতে না পারলে হেবা দলিলটি বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা ১০০%। হেবা হওয়ার পর প্রথম কাজ হলো নামজারি করা।

৬. সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের ৫৩(গ) ধারা অনুযায়ী সর্বশেষ রেকর্ড বা নামজারি খতিয়ানে মালিক বা মালিকের পূর্বসূরির নাম না থাকলে জমি বিক্রি করতে পারবেন না এবং বিক্রি করলে দলিল বাতিল হবে।
সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২ এর ধারা ৫৩-গ - "রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন ১৯৫০-এর অধীনে প্রস্তুতকৃত সর্বশেষ খতিয়ানে কোন সম্পত্তি সম্পর্কে কোন ব্যক্তির নাম না থাকলে কোন সম্পত্তি বিক্রয় করা যাবে না এবং অন্যথায় যে কোন বিক্রয় বাতিল হবে। বিক্রেতা উত্তরাধিকার সূত্রে মালিক হলে খতিয়ানে তার বা তার পূর্বপুরুষের নাম থাকতে হবে, বিক্রেতা উত্তরাধিকার ব্যতীত অন্য কোন পন্থায় মালিক হলে খতিয়ানে তার নাম থাকতে হবে।
৭. দলিল মালিকানা বা স্বত্ব প্রমাণ করে কিন্তু দখল নয় অর্থাৎ দলিল মালিকের দখল প্রমাণ করে না। দখল প্রমাণিত হয় রেকর্ড বা নামজারি, খাজনা/ভূমি উন্নয়ন করের দাখিলা ইত্যাদি দ্বারা। স্মরণ রাখতে হবে যে, মালিকানা স্বত্ব ও দখল মিলিয়ে আপনি একটি জমির বাস্তবে মালিক। নইলে মঙ্গল গ্রহে কোন জমি কিনলেও তা আপনার কোন মঙ্গল করবে না।

৮. বর্তমানে ভূমি উন্নয়ন কর দেওয়া বাধ্যতামূলক এবং ৮.২৫ একর বা ২৫ বিঘা বা তার কম কৃষি জমি হলে ভূমি উন্নয়ন কর মওকুফ হলেও এখন প্রতি বছর ভূমি উন্নয়ন করের মওকুফ দাখিলা কাটা বাধ্যতামূলক। ক্রয়কৃত জমির নামজারি না থাকলে ভূমি উন্নয়ন কর দিতে পারবেন না ইত্যাদি।

৯. রেকর্ড, নামজারি, খাজনা / ভূমি উন্নয়ন করের দাখিলা ইত্যাদি দখলের পক্ষে প্রমাণ এবং এরা স্বত্বের দলিল না হলেও মালিকানার পক্ষে সাক্ষ্য বা এভিডেন্স।

১০. ২০ বছর আগেও বহু মানুষের অজানা ছিলো, বর্তমানে প্রায় সবাই জানেন যে, দলিল রেজিষ্ট্রেশনের দিনই সার্টিফাইড কপি বা জাবেদা নকলের আবেদন দেওয়া যায় এবং সচরাচর ১-৭ দিনের মধ্যে কপি পাওয়া যায় এবং কপি পাওয়ার সাথে সাথেই নামজারির আবেদন দিয়ে দিবেন ভূমি অফিসে। 

এই জাবেদা কপিটি হবে "মূল দলিলের অবিকল নকল"। মূল দলিল পাওয়ার পর আরেকটি সার্টিফাইড কপি তুলে নিবেন - এটি হবে "মূল দলিলের বালাম বইয়ে কৃত নকলের অবিকল নকল"। রেজিস্ট্রী অফিস পুড়ে গেলে, বালাম বই নষ্ট হয়ে গেলে ৫০ বছর পর মূল দলিল নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে বা মূল দলিল প্রমাণ করা কঠিন হয়ে যায় - এই সার্টিফাইড কপিদ্বয় মূল দলিলকে প্রমাণ করবে এবং সর্বদা মূল দলিলের প্রত্যয়ণ হিসাবে থেকে যাবে।

১১. নামজারি খতিয়ান না থাকলে ব্যাংক ঋণ, গৃহ ঋণ ইত্যাদি পাওয়া যায় না।

১২. নামজারি করা না থাকলে শরীকরা অগ্রক্রয়ের সুবিধা পেতে পারেন। নামজারি করে খতিয়ান পৃথক করে নিলে অগ্রক্রয়ের সম্ভাবনা সাধারন ভাবে থাকে না।

১৩. জরীপ ও নতুন চালু হওয়া বিডিএস জরীপে নামজারি অতীব গুরুত্বপূর্ণ।

১৪. সর্বশেষ রেকর্ড বা নামজারি খতিয়ানের পর নতুন নামজারির আবেদনে সর্বশেষ রেকর্ড বা সর্বশেষ নামজারি খতিয়ানের পূর্বে কি হয়েছিলো তা নিয়ে কোন প্রশ্ন করার এখতিয়ার ভূমি অফিস রাখে না।

১৫. আরেকটি ভুল দয়া করে কেউ করবেন না। মাঠপর্চা বা ডিপি খতিয়ান হয়েছে কিন্তু চূড়ান্ত প্রিন্ট রেকর্ড প্রকাশিত হয় নাই। এসময় সাবেক রেকর্ড দিয়ে জমি কিনলে অবশ্যই দলিলে মাঠপর্চা / ডিপি খতিয়ানের বিবরণ যথা নতুন দাগ, ডিপি খতিয়ানের বিবরণ দিবেন।
জমি কেনার পর অনেকে পরামর্শ দিবেন যে, নামজারি করবার দরকার নাই, প্রিন্ট খতিয়ান আসলে একবারে নামজারি করে নিবেন, এখন নামজারি করলেও তো আবার নামজারি করতে হবে, কি দরকার দুইবার টাকা খরচ করবার? অনুগ্রহপূর্বক এই পরামর্শে কর্নপাত করবেন না এবং এটা আবেগী ও ভুল পরামর্শ।

জমি কেনার সাথে সাথেই সার্টিফাইড কপি তুলে নামজারি করে নিবেন। এরপর প্রিন্ট খতিয়ান আসলে আবার নামজারি করে নিবেন। যেহেতু নতুন রেকর্ডে খতিয়ান ও দাগনং পরিবর্তিত হয়, তাই নামজারি করতেই হয়। লক্ষ লক্ষ টাকা দিয়ে জমি কিনলেন আর জমিটিকে সুরক্ষার জন্য, নিজেকে ও ভবিষ্যত বংশধরদের নিরাপদ করবার জন্য সামান্য কিছু টাকা দুইবার খরচ করতে পারবেন না - এটা যৌক্তিক নয়।
১৬. বিধানটি আগে থাকলেও নতুন ভূমি উন্নয়ন কর আইন, ২০২৩ এ ভূমি উন্নয়ন কর বকেয়া থাকলে জমি খাস করার বিধান করা হয়েছে এবং তা প্রয়োগও হবে মনে হয় এবং তিন বছর হয়ে গেলে বকেয়া ভূমি উন্নয়ন কর আদায় সরকারের জন্য তামাদি হয়ে যায় - এ বিধান অকার্যকর করা হয়েছে, এখন ভূমি উন্নয়ন কর বকেয়ার কোনো তামাদি নাই।

সুতরাং বুঝতেই পারছেন, নামজারি করা না থাকলে শুধু একাধিক বিক্রয়ের আশঙ্কাই বিদ্যামান থাকেনা, পরবর্তীতে আপনার অর্জিত সম্পত্তিতে দখলে থাকলেও পরবর্তীতে আপনার অবর্তমানে আপনার উত্তরাধিকারগণ উক্ত সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হবার আশঙ্কা থাকে।

তাই যাদের নামজারি করা নেই, তারা দ্রুত নামজারি করে ফেলুন ও নিয়মিত ভূমি উন্নয়ন কর প্রদান করুন ও নিজেকে ও বংশধরদের নিরাপদ রাখতে সহায়তা করুন এবং অন্যদের নামজারিতে উৎসাহী করুন।
Read More...

মঙ্গলবার, ২১ জানুয়ারি, ২০২৫

বাটোয়ারা বা বন্টননামা দলিল না করলে কি কি জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে?

বণ্টননামা দলিল মূলত একটি লিখিত চুক্তি যা পরিবার বা অংশীদারদের মধ্যে সম্পত্তি ঠিকঠাক ভাবে বন্টন করার উপায় নির্ধারণ করে। জমি, বাড়ি বা অন্যান্য স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি যদি একাধিক ব্যক্তির মালিকানায় থাকে, তবে সেগুলোকে নির্দিষ্ট নিয়মে ভাগ করার জন্য বণ্টননামা দলিল অত্যন্ত কার্যকর একটি পদ্ধতি। 

১৮৯৯ সালের স্ট্যাম্প এক্টের ২ (১৫) ধারায় বলা হয়েছে বণ্টন দলিল ও বণ্টক দলিল অর্থ একই। যখন কোন সম্পত্তির সহ-শরিকগণ তাদের সম্পত্তি ব্যক্তিগত মালিকানায় পৃথকভাবে ভাগ করে নেয় বা নিতে সম্মত হয়ে কোন দলিল করেন তাকেই বণ্টন দলিল বলা হয়।
বাটোয়ারা বা বন্টননামা দলিল
এই ভূখণ্ডের ইতিহাস থেকে দেখা যায়, অতীতে লিখিত দলিলের ব্যবহার কম ছিল। মানুষ মুখে মুখে জমি-জমা বা তাদের সম্পত্তি বন্টন করে নিত। তখনকার দিনে দলিলের রেজিস্ট্রীও ইচ্ছামত ছিল কারন সে আমলে মানুষের জবানের মূল্যয়ন ছিল। মানুষের মুখের কথাই দলিলের মত ছিল। কিন্তু বর্তমানে লিখিত দলিল ছাড়া কেই কারো উপর তেমন ভরসা করে না। তাই বন্টননামা বা বাটোয়ারা দলিল রেজিস্ট্রী করে নিতে হয়।

বন্টননামা দলিল না করলে নিম্নোক্ত জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে?

১. দাখিলা (খাজনা/এলডি ট্যাক্স): অধিকাংশ ওয়ারিশসূত্রে নামজারির আবেদনে রেকর্ডীয় মালিকের জমির পরিমাণ বেশি থাকে। ফলে খাজনা/এলডি ট্যাক্স এর পরিমাণও বেশি থাকে এবং আবেদনকারী খাজনা পরিশোধ ছাড়াই মিউটেশনের আবেদন করেন। অথচ ভূমির মালিকানা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে দখল, দাখিলা ও দলিল অত্যাবশ্যকীয়।

২. দখল: অধিকাংশ ওয়ারিশসূত্রে নামজারির আবেদনে রেকর্ডীয় মালিকের একাধিক খতিয়ানে ও দাগে জমি থাকে। কিন্তু ওয়ারিশসূত্রে আবেদনকারী সকল দাগে অংশ অনুসারে দখলে থাকেন না। বরং এক বা গুটিকয়েক দাগে দখল থাকে। সকল দাগে অংশ মোতাবেক দখল না থাকায় মালিকানা পরিবর্তনের শর্তানুসারে (দখল, দাখিলা ও দলিল) মিউটেশনের মাধ্যমে মালিকানা পরিবর্তন সম্ভব নয়।

৩. মিউটেশন তামিল: ওয়ারিশসূত্রে (অনেক ক্ষেত্রে ওয়ারিশের সংখ্যা ২০ জন বা তার বেশি) নামজারির একাধিক আবেদন মঞ্জুর হলে সেক্ষেত্রে ২নং রেজিষ্টারে তামিল করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।

৪. ওয়ারিশকে বঞ্চিত করা: অনেকক্ষেত্রে এক বা একাধিক ওয়ারিশকে অথবা বিশেষ করে সৎ ভাই-বোনদের বঞ্চিত করা হয় এবং ১৫০ ধারার মামলার সংখ্যা বৃদ্ধি পায়।

৫. খাজনা/এলডি ট্যাক্স আদায়ে জটিলতা: একজন ওয়ারিশ মিউটেশনের মাধ্যমে রেকর্ডীয় খতিয়ান থেকে বের হয়ে গেলে বাকি ওয়ারিশদের রেকর্ডীয় খতিয়ান সমুদয় খাজনা/এলডি ট্যাক্স পরিশোধ করতে হয় নতুবা বাকি ওয়ারিশদের খাজনা/এলডি ট্যাক্স বকেয়া হিসেবে থেকে যায়।

৬. হস্তান্তর পরবর্তী দখল: এক বা একাধিক ওয়ারিশ প্রভাবশালী ব্যক্তির কাছে জমি হস্তান্তর করলে নতুন প্রভাবশালী মালিক একাধিক দাগে ও খতিয়ানে জমি ক্রয় করলেও তুলনামূলক দামি ও সুবিধাজনক জমি দখল করেন। ফলে বাকি ওয়ারিশরা ন্যায্য অধিকারের আশায় দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ান।

৭. পরবর্তী জরিপ: একাধিক দাগে ও খতিয়ানে অংশ অনুযায়ী জমি থাকলেও এক বা গুটিকয়েক দাগে ভোগদখল থাকলে পরবর্তীতে জরিপের সময় জটিলতার সৃষ্টি হবে। একাধিক দাগে জমি থাকলে দখল অনুসারে এক দাগে রেকর্ড করার সুযোগ থাকবে না।
Read More...

আপনার জমি বা সম্পত্তির দলিল হারিয়ে গেলে কি করবেন?

এটা আমাদের সবারই জানা যে জমি ​জমা বা সম্পত্তি ক্রয় বিক্রয়, বণ্টন এবং হস্তান্তর বিভিন্ন প্রকার দলিলের মাধ্যমে হয়ে থাকে। জমির দলিল আমাদের মূল্যবান কাগজগুলির মধ্যে একটি। জমির দলিলে ক্রেতা বিক্রেতার পূর্ণ পরিচয়, জমির একটি পূর্ণাঙ্গ পরিচিতি, সম্পাদন ও রেজিস্ট্রি হবার তারিখ এবং জমির মূল্য সহ আরও প্রয়োজনীয় তথ্য সন্নিবেশিত থাকে। তবে লিখিত এই দলিল কোন না কোন ভাবে হারিয়ে যেতে পারে।

জমির দলিল হারিয়ে গেলে করণীয় কাজগুলো সঠিকভাবে করলে হারিয়ে যাওয়া দলিল সহজে পাওয়া যাবে। অনেক সময় অসাবধানতা বা দূর্ঘটনাজনিত কারনে মূল্যবান দলিল বা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র হারিয়ে যায়। যেমনঃ- কোন দুর্ঘটনায় বা আগুনে পুড়ে যাওয়ার কারনে বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে মূল্যবান কাগজ বা দলিল নষ্ট হয়ে যেতে পারে। ঠিক এই সময় হারানো কাগজ ফিরে পাবার জন্য বা কাগজের নকল সংগ্রহ করার জন্য পুলিশের সাহায্য নেয়া যাবে।
জমি বা সম্পত্তির দলিল হারিয়ে গেলে কি করবেন
আমরা জানি কোন ব্যক্তির প্রয়োজনীয় কাগজপত্র হারিয়ে গেলে অতি দ্রুত সংশ্লিষ্ট থানায় গিয়ে জিডি করতে হয়। জিডি করার পর পুলিশ অভিযোগকারীকে জিডির একটা কপি এবং কপির সাথে একটি নম্বর প্রদান করবেন। সেটিকে আপনার সংরক্ষণ করে রাখতে হবে। এরপর পুলিশ হারিয়ে যাওয়া কাগজ খুঁজে বের করার চেষ্টা করবেন বা নকল বা নতুন কাগজপত্র বা দলিল প্রদান করার জন্য অনুমতি প্রদান করবেন।

সাধারণ ডায়েরি বা জিডি

দলিল হারিয়ে গেলে প্রথমে সংশ্লিষ্ট থানায় সাধারণ ডায়েরি বা জিডি করুন। এক্ষেত্রে সাধারণ ডায়েরি ফরমেট হতে পারে এমন-

বরাবর, অফিসার ইন চার্জ, ………… (থানার নাম ও ঠিকানা)

বিষয়ঃ সাধারণ ডায়েরি প্রসঙ্গে।

জনাব, বিনীত নিবেদন এই যে, আমি ………… (নাম/বয়স/পিতার নাম/পূর্ণ ঠিকানা) বিগত ………… ইং তারিখে …… (স্থানের নাম) হইতে বাস/রিক্সাযোগে ………(স্থানের নাম) যাবার সময় অনুমানিক ……… ঘটিকার সময় আমার সঙ্গে থাকা বিগত ……… ইং তারিখে রেজিঃকৃত ………… নং ……… দলিলটি, যার দাতার নাম ………… এবং গ্রহিতার নাম …………, হারিয়ে যায়। পরবর্তীতে বহু খোঁজাখুঁজির পর দলিলটি খুঁজে পাই নি। এমতাবস্থায় উপরোক্ত বিষয়টি সাধারণ ডায়েরিভুক্ত করার সুআজ্ঞা হয়।

বিনীত - (নাম/মোবাইল নম্বর)

এখানে আপনি চাইলে আপনার জমির তফসিল অন্তর্ভুক্ত করতে পারেন। সাধারণ ডায়েরি করার পর একটি জিডি নম্বর দিবে। এটির এক কপি নিজের সংগ্রহে রাখুন। পুলিশ দলিলটি খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করবে। খুঁজে না পেলে মূল দলিলের সত্যায়িত নকল (Certified Copy) তুলতে হবে।
মনে রাখবেন, দলিল পুড়ে গেলে বা প্রাকৃতিক দূর্যোগের জন্য দলিল নষ্ট হয়ে গেলে থানায় জিডি করে রাখবেন।

আপনারা জমির দলিল দুটি উপায়ে উঠাতে পারবেন

প্রথম উপায় : প্রথমে নিচের তিনটি ধাপ অনূসরণ করুণ!

১) প্রথম ধাপ : 
  • প্রথমে জমির দাগ নাম্বার জানুন।
  • আপনি যে দাগটি জানেন সেটা কি দাগ তা নিশ্চিত হোন
  • আপনি যে দাগটি জানেন সেটা CS দাগ, না RS দাগ, না BS দাগ নিশ্চিত হোন
২) ধাপ ২:
  • দাগ নম্বর জেনে খতিয়ান নাম্বার জানুন।
  • কোথা থেকে জানবেন? -ইউনিয়ন ভূমি বা তফসিল অফিস হতে।
৩) ধাপ ৩: 
খতিয়ানে যদি নামজারি বা খারিজ করা থাকে তাহলে দেখুন কার নামে নামজারি করা। নামজারি বা জমাভাগের কেস বা নথি বের করে নিন। নামজারি বা খারিজের নথিতে দলিলের নাম্বার দেয়া থাকে সেখান থেকে দলিল নাম্বার নিয়ে নকল বা সার্টিফাইড কপির জন্য আবেদন করবেন।

কোথায় করবেন? জেলা রেকর্ড রুম অথবা সাব রেজিস্ট্রি অফিস। 
  • আপনার জমির দলিল যদি বর্তমান সাল থেকে ৫-৬ বছর আগের হয় তাহলে সাব রেজিস্টি অফিস হতে দলিলের নকল বা সার্টিফাইড কপি নিতে পারবেন।
  • আর দলিলটি যদি অনেক বছর আগের হয় তাহলে জেলা রেজিস্ট্রার অফিস এর জেলা রেকর্ড রুম হতে সংগ্রহ করতে হবে।
উপায় ২:-তিনটি ধাপ অনুসরণ করে দলিল নম্বর বা দলিল না পান তখন দলিল তল্লাশি বা সার্চ করতে হবে।
🔎 তল্লাশি বা সার্চ করতে যা যা লাগবে -
  • সম্ভাব্য সাল
  • দলিল দাতা ও গ্রহীতার নাম
  • দলিল দাতা ও গ্রহীতার বাবার নাম
  • দাগ নম্বর ও মৌজার নাম

আসুন বিষয়টি একটি দৃষ্টান্তের মাধ্যমে বুঝে নেই

ধরূণ আপনার বাবা আজিজ পৈত্রিকসূত্রে প্রাপ্ত ১৬ বিঘা জমি ভোগদখল করাকালে ২ বছর পূর্বে মারা যান। আপনার বাবা আজিজের মৃত্যুর পর এক পুত্র আব্দুল হক প্রামানিক ও এক কন্যা সেলিনা বেগম ওয়ারিশ থাকেন। আপনার বাবার ওয়ারিশ সূত্রে প্রাপ্ত ১৬ বিঘা সম্পত্তির সি.এস খতিয়ান, এসএ এবং আরএস খতিয়ান এবং আপনার দাদা (পিতামহ) এর নামের দলিলগুলোর ফটোকপি থাকলেও মূল কাগজপত্র খুঁজে পান নাই ।

মূল কপি কি প্রকারে সংগ্রহ করবেন সে বিষয়টা তুলে ধরা হলোঃ- আপনি আপনার বাবা আজিজের মৃত্যুকালে রেখে যাওয়া ঐ সম্পত্তির সি.এস খতিয়ান ও এসএ এবং আরএস খতিয়ানের জাবেদা নকল ভোলা কলেক্টরেট অফিস (জেলা প্রশাসকের কার্যালয়) রেকর্ড রুম হতে নির্দিষ্ট জাবেদা নকলের ফরমে আবেদন করে জাবেদা নকল তুলতে পারবেন। এছাড়া আপনার দাদা (পিতামহ) এর নামীয় দলিল ভোলা জেলা রেজিষ্টার অফিস হতে জাবেদা নকল তুলতে পারবেন। আপনি দলিলের ফটোকপি দেখে দলিলের নম্বর অনুসারে জাবেদা নকলের জন্য আবেদন করতে পারবেন।

দলিলের নকল (Certified Copy) প্রাপ্তির নিয়মাবলী

রেজিস্ট্রেশন আইন ১৯০৮ এর ৫৭(১) ধারা মোতাবেক, প্রয়োজনীয় ফিস পরিশোধ সাপেক্ষে, যে কোন ব্যক্তি ১ নং (স্থাবর সম্পত্তি সংক্রান্ত দলিলের) ও ২ নং (রেজিস্ট্রি করতে অস্বীকার করা দলিলের) রেজিস্টার বহি ও ১ নং রেজিস্টার বহি সম্পর্কিত সূচিবহি পরিদর্শন করতে পারে এবং উক্ত আইনের ৬২ ধারার বিধানাবলি সাপেক্ষে উক্ত দলিলের সার্টিফাইড কপি গ্রহন করতে পারে।

রেজিস্ট্রেশন আইন ১৯০৮ এর ৫৭(২) ধারা মোতাবেক, প্রয়োজনীয় ফিস পূর্বে পরিশোধ সাপেক্ষে, দলিল সম্পাদনকারী বা তার এজেন্ট এবং সম্পাদনকারীর মৃত্যুর পর যে কোন আবেদনকারী ৩ নং নিবন্ধিত উইলের রেজিস্টার ৩ নং লিপিবদ্ধ বিষয়ের (অর্থাৎ উইল বা অছিয়ত দলিলের নকল বা সার্টিফাইড কপি) এবং ৩ নং বহি সম্পর্কিত সূচিপত্রের নকল গ্রহন করতে পারে।

রেজিস্ট্রেশন আইন ১৯০৮ এর ৫৭(৩) ধারা মতে, প্রয়োজনীয় ফিস পূর্বে পরিশোধ সাপেক্ষে, দলিলের সম্পাদনকারী বা দাবীদার ব্যক্তি বা তার এজেন্ট অথবা প্রতিনিধি ৪ নং বহিতে লিপিবদ্ধ বিষয়ের নকল গ্রহন করতে পারে।

রেজিস্ট্রেশন আইন ১৯০৮ এর ৫৭(৪) ধারা মতে, ৩ নং ও ৪ নং বহিতে লিখিত বিষয়ের তল্লাশি, সাব-রেজিস্ট্রার এর মাধ্যমে করা যাবে।

কিভাবে দলিল তল্লাশ করবেন?

যদি মূল দলিল থাকে- রেজিস্ট্রি অফিসে দলিলের রেজিস্ট্রি কার্যক্রম শেষ হলে মূল দলিলের শেষ পৃষ্টার উল্টোদিকে “দলিলটি কত সালের, কত নম্বর বালাম বইয়ের, কত পৃষ্ঠা থেকে কত নম্বর পৃষ্ঠায় নকল করা হয়েছ, তা লিখে সাব-রেজিস্ট্রার কর্তৃক স্বাক্ষর করতে হয় । এভাবে খুব সহজে সহজেই রেজিস্ট্রি অফিসে থেকে দলিলের নকল উঠানো বা পাওয়া যায়।

মূল দলিল না থাকলে- রেজিস্ট্রি অফিসে দলিল রেজিস্ট্রি শেষ হলে দলিলের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি তথ্য নিয়ে সূচিবহি তৈরি করা হয়। একটি সূচিবহি তৈরি হয় দলিলে উল্লিখিত জমির দাতা/বিক্রেতা, গ্রহিতা/ক্রেতা বা অন্য কোন পক্ষের নাম দিয়ে, আর একটি তৈরি হয় জমির মৌজার নাম দিয়ে।

দলিলের নকল প্রাপ্তির আবেদনের নিয়মাবলি

রেজিস্ট্রেশন বিধিমালা ২০১৪ এর ১০৮ অনুচ্ছেদে সূচিবহি তল্লাশ ও দলিলের নকলের জন্য আবেদনের নিয়মাবলী লিপিবদ্ধ আছে।

এ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, যে সকল ক্ষেত্রে তল্লাশ ও পরিদর্শনের জন্য কোন ফিস পরিশোধযোগ্য নহে, সে সকল ক্ষেত্র ব্যতিত, সকল ক্ষেত্রে নকলের জন্য আবেদন দাখিল করিবার পূর্বে (৩৬ নং ফরম অনুযায়ী) তল্লাশ ও পরিদর্শনের জন্য আবেদন করিতে হইবে। এরপর ৩৭ নং ফরমে নকলের জন্য আবেদন করতে হবে।
Read More...

রবিবার, ১৯ জানুয়ারি, ২০২৫

বহু টাকা বিনিয়োগে ফ্ল্যাট বাড়ি নাকি ব্যবসা?

দৃষ্টি নন্দন ফ্ল্যাট বাড়ী দেখে অনেক মধ্যবিত্তরাই নিজের একটি স্থায়ী আবাস্থল বানানোর চেষ্টা করে থাকেন। এক তো রিয়েল স্টেট ব্যবসায় রয়েছে মিডল ক্লাস ট্র্যাপ তার উপর বিনিয়োগ সংক্রান্ত লোকসান। কোন ব্যক্তি হয়তো তার সারা জীবনের সঞ্চিত টাকা দিয়ে একটি ফ্ল্যাট কেনার স্বপ্ন দেখেন। কিন্তু তাদের অনেকেই জানেন না, এতে যেমন রয়েছে ঝুঁকি তেমনি রয়েছে ব্যবসায়িক লোকসান। আসুন বিষয়টি বিস্তারিত জেনে নেই।

বাংলাদেশে এসেটের দামের তুলনায় ভাড়া নিতান্তই কম!! উদাহরণ স্বরূপ বলি। ধরুন, আপনি রাজধারীর উত্তরায় ২০০০ স্কয়ার ফিটের একটা বড়সড় ফ্ল্যাট কিনলেন, দাম নিল দুই কোটি টাকা। এই বাসার ভাড়া হবে বড়জোড় মাসিক পঞ্চাশ হাজার টাকা।
বহু টাকা বিনিয়োগে ফ্ল্যাট বাড়ি নাকি ব্যবসা

ধরে নিলাম কেউ বাসাটা কিনে নিজেই থাকা শুরু করলেন।


এটা না কিনে, পঞ্চাশ হাজার টাকা ভাড়া দিয়ে সে এই বাসাতেই এক বছরে মাত্র ছয় লাখ টাকা দিয়ে থাকতে পারে। মানে দশ বছর থাকতে পারে ষাট লাখ টাকায়। তিরিশ বছর থাকতে পারে এক কোটি আশি লাখ টাকায়!

এই দুই কুটি টাকা হালাল এবং বিজনেস পন্থায় ইনভেস্ট করে প্রতি মাসে অন্ততঃ দুলক্ষ টাকা অনায়সে বানাতে পারে। তাহলে বৎসরে চব্বিশ লক্ষ টাকা। যদি আমরা এটা ত্রিশ বছর ধরি তাহলে (৩০×২৪=৭,২০,০০০০০) সাত কোটি বিশ লক্ষ টাকা! এটা কতটা সফলতা বিচার আপনার হাতে।

কিন্তু যদি আপনি ফ্ল্যাটই কিনতেন তাহলে এই ত্রিশ বছরে আপনার ফ্ল্যাট এর চেহারার অবস্থা কি দাঁড়াবে একবার ভেবে দেখুন তো? ফ্ল্যাট তো জমি না, এর ডেপ্রিসিয়েশন (অবচয়) আছে। এখনকার বাজারে ত্রিশ বছরের পুরনো একটা ফ্ল্যাট বিক্রি করতে যান, বুঝবেন। ক্রেতা পাওয়া দুস্কর! আর নিজেরা থাকলে প্রজন্মের রুচি ও দাবি অনুযায়ী বিল্ডিং ভেংগে আবার নতুন করে বাড়ি বানাতে কি পরিমাণ নতুন পুঁজি প্রয়োজন তার হিসেব মিলিয়ে নিন! কিন্তু যদি ভাড়া থাকেন পুরো ত্রিশ বছরই নতুন ফ্ল্যাটে থাকতে পারবেন, সুবিধা অনুযায়ী এলাকায় শিফট করতে পারবেন, পরিবেশ ভাল না লাগলে বদলে ফেলতে পারবেন।
"নিজের বাড়ি" একটা বিংশ শতকের এলিটিস্ট আবেগ। একে প্রশ্রয় নিতান্তই বড়সড় বোকামি!

অনেকে আবার লোন করে ফ্ল্যাট কিনেন। বিশ হাজার টাকা ভাড়া দিয়ে যে ফ্ল্যাটে থাকা যায়, সেই ফ্ল্যাটে ডাউন পেমেন্টের টাকা পকেট থেকে দিয়ে চল্লিশ হাজার টাকা প্রতি মাসে কিস্তি দেয়। এসেট হয়ে যায় লায়াবিলিটি, প্রতি মাসে যার খরচ অতিরিক্ত বিশ হাজার টাকা!

এবার ভেবে দেখুন, টাকা জমিয়ে জমিয়ে ফ্ল্যাট না কিনে সেই থাকায় ব্যবসায় বিনিয়োগ করেও আপনি লাভবান হতে পারেন। 

Read More...

শনিবার, ১৮ জানুয়ারি, ২০২৫

জমির পর্চা বা খতিয়ান খারিজ নামজারি ও ম্যাপ বা নকশা তুলতে কি করতে হবে?

জমির পর্চা বা খতিয়ান খারিজ নামজারি ও ম্যাপ বা নকশা তুলতে কি করতে হবে এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করবো এই পর্বে। আপনার বাবা-দাদা,নানা-নানির এবং পূর্ব পুরুষদের নামে কোথায় কতটুকু জমি আছে জানতে চান? জমির কাগজ নিতে যেগুলি লাগবে সেগুলো হলো : 
  • বিভাগ 
  • জেলা
  • উপজেলা 
  • মৌজা
  • যার নামের জমি তার নাম এবং তার পিতার নাম। 
হতেই পারে আপনার জমির কাগজপত্র হারিয়ে গেছে অথবা পুড়ে বিনষ্ট হয়ে গেছে। একটি জমির যে সকল উল্লেখযোগ্য ডকুমেন্ট থাকে তা হলো-
  • পর্চা বা খতিয়ান
  • দলিল
  • ম্যাপ বা নকশা
এই ডকুমেন্টগুলো ছাড়া আপনি জমি বিক্রয়, হস্তান্তর অথবা ব্যাংক লোন হতে নানান সমস্যা হয়। সে কারণে, জমির খতিয়ান, দলিলসহ সকল কাগজপত্র সংগ্রহে রাখার জন্য সরকারি নানান দপ্তর রয়েছে, যারা ভূমি সংক্রান্ত কাগজপত্র সংগ্রহ করে রাখে। 

এখন আপনার কাজ হল, ঐ সকল দপ্তরগুলো কে নিশ্চিত করে তাদের শরণাপন্ন হওয়া ও কাগজপত্র গুলো সংগ্রহ করা। নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো, কোথায়, কীভাবে এবং কত সময়ের ভেতরে আপনি জমির খতিয়ান, দলিল ও নকশা সংগ্রহ করবেন।
জমির পর্চা বা খতিয়ান খারিজ নামজারি ও ম্যাপ বা নকশা

প্রথমত,আপনার জমির খতিয়ান বা পর্চা কোথায় পাবেন?

জমির পর্চা বা খতিয়ান মূলত চারটি অফিসে পাবেন। তা হলো,
  • ইউনিয়ন ভূমি অফিস
  • উপজেলা ভূমি অফিস
  • জেলা ডিসি অফিস
  • সেটেলমেন্ট অফিস
ইউনিয়ন ভূমি অফিস বা তহশিল অফিস
ইউনিয়ন ভূমি অফিসে যদিও খতিয়ান বা পর্চার বালাম বহি থাকে কিন্তু আপনি এই অফিসে হতে খতিয়ানের কপি নিতে পারবেন না। ইউনিয়ন ভূমি অফিস হতে শুধু খসরা খতিয়ান নিতে পারবেন যেটা আইনত কোন মূল্য নেই তারপরেও এই অফিসটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ আপনার জমির খতিয়ান নাম্বার জানা না থাকলে এই অফিস থেকে জেনে নিতে পারবেন এছাড়া জমির খাজনা বা ভূমি উন্নয়ন কর এই অফিসে দিতে হয়।

উপজেলা ভূমি অফিস
যদিও উপজেলা ভূমি অফিসের মূল কাজ নামজারী বা খারিজ বা মিউটেশন করা তবে খসরা খতিয়ান তুলতে পারবেন। এই অফিস হতেও খতিয়ানের সার্টিফাইড পর্চা বা কোর্ট পর্চা তুলতে পারবেন না।

জেলা ডিসি অফিস
এই অফিস হতে পর্চা বা খতিয়ানের সার্টিফাইড কপি সংরক্ষণ করতে পারবেন। এই অফিসের খতিয়ান এর গুরুত্ব সর্বাধিক। সব জায়গায় এই অফিসের খতিয়ান এর গুরুত্ব রয়েছে।

সেটেলমেন্ট অফিস
শুধুমাত্র নতুন রেকর্ড বা জরিপের পর্চা / খতিয়ান এই অফিস হতে সংগ্রহ করা যাবে।
পাশাপাশি নতুন রেকর্ড এর ম্যাপ ও সংগ্রহ করা যায়।

প্রশ্নঃ খতিয়ান তুলতে কত টাকা লাগবে.?
উত্তরঃ সি এস, এস এ, আর এস, এর জন্য কত টাকা দিতে হবে তা নির্ভর করে ঐ স্থানের সিন্ডিকেটের উপর। তবে সিটি জরিপের জন্য ১০০ টাকা খরচ হবে।

দ্বিতীয়ত, আপনার জমির দলিল বা বায়া দলিল কোথায় পাবেন?
দলিল বা দলিল এর সার্টিফাইড কপি বা নকল মূলত দুটি অফিস হতে সংগ্রহ করা যায়, তা হলো।
  • উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রি অফিস।
  • জেলা রেজিস্ট্রি বা সদর রেকর্ড রুম অফিস।
➤উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রি অফিস
যেখানে নতুন দলিল রেজিস্ট্রেশন করা হয় এই অফিস হতে নতুন দলিলের নকল ও মূল দলিল পাওয়া যায়। কিন্তু পুরাতন দলিল বা বায়া দলিল এই অফিসে পাওয়া যায় না।

➤জেলা রেজিস্ট্রি অফিস বা সদর রেকর্ড রুম
এই অফিসে নতুন বা পুরাতন দলিলের সার্টিফাইড কপি বা নকল পাওয়া যায়। যদি কোন দলিল সঠিকভাবে তল্লাশি করে না পাওয়া যায় তাহলে আরো কিছু প্রসেসের মধ্য দিয়ে আপনার কাঙ্খিত দলিলখানা সংগ্রহ করতে পারবেন।

প্রশ্নঃ দলিল তুলতে কত টাকা খরচ হয়.?
উত্তরঃ সরকারি খরচ যদিও সামান্য কিন্তু নকলের খরচ নির্ভর করে ঐ স্থানের সিন্ডিকেটের উপর।

আপনার জমির মৌজা ম্যাপ বা নকশা কোথায় পাবেন?
সাধারণত ম্যাপ বা নকশা দুইটি অফিসে পাবেন, তা হলো
  • জেলা ডিসি অফিস
  • ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর ( DLR) অফিস, ঢাকা।
➤জেলা ডিসি অফিস:
  • এই অফিস হতে সিএস, এসএ, আরএস, বিএস যেকোনো মৌজা ম্যাপ সংগ্রহ করা যাবে।
  • সংগ্রহ করতে যা লাগবে আবেদন ফরম + ২০ টাকার কোর্ট ফি এবং ৫০০ টাকা নগদ জমা বাবদ বা ডি.সি.আর বাবদ। অর্থাৎ ৫৩০ টাকায় মৌজা ম্যাপ তুলতে পারবেন।
➤ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর, (তেজগাঁও সাতরাস্তার মোড়), ঢাকা।
  • সারা বাংলাদেশের যে কোনো মৌজা ম্যাপ, সিএস, এসএ, আরএস, বিএস, জেলা ম্যাপ, বাংলাদেশ ম্যাপ উক্ত অফিস হতে তুলতে পারবেন।
  • এই অফিসের ম্যাপের গ্রহণযোগ্যতা ও অনেক বেশি। সারা বাংলাদেশের যে কোন ম্যাপ এই অফিসে পাওয়া যায়। ম্যাপ তুলতে খরচ আবেদন ফরম + কোর্ট ফি + ডি.সি.আর মোট= ৫৫০/= টাকা মাত্র।
❖প্রশ্নঃ ম্যপ তুলতে কতদিন সময় লাগে?
উত্তরঃ আবেদন করার দিন হতে, ৫-৮ কার্য দিবসের ভিতরে ম্যাপ সরবরাহ করা হয়।
Read More...

আপনার জমির দলিল বৈধ কি না কিভাবে বুঝবেন?

জমি কেনা বা বেচা একটি গুরুত্বপূর্ণ লেনদেন এবং এর সাথে জড়িত আইনি প্রক্রিয়াগুলি বোঝা সংশ্লিষ্ট সকলেরই জরুরি। জমির দলিল হলো একটি গুরুত্বপূর্ণ নথি যা মালিকানার অধিকার প্রমাণ করে। তাই, জমি কেনার আগে দলিলটি সঠিকভাবে যাচাই করে নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

জমি কেনা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ এবং আইনি জটিলতা এড়াতে জমির দলিলের বৈধতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। একটি জমির দলিল বৈধ কিনা তা নির্ধারণ করার জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে।

১. দলিলের মূল কপি পরীক্ষা করুন:
  • নিশ্চিত করুন যে দলিলটি সঠিকভাবে সাব-রেজিস্ট্রারের দ্বারা স্বাক্ষরিত এবং সিল করা আছে।
  • দলিলের মূল কপিতে থাকা ছবি এবং মালিকের বর্তমান ছবি মিলে যাচ্ছে কিনা তা পরীক্ষা করুন।
  • দলিলের সকল পাতায় সঠিকভাবে স্ট্যাম্প লাগানো আছে কিনা তা নিশ্চিত করুন।
২. দলিলের তথ্য যাচাই করুন:
  • দলিলে উল্লেখিত মালিকের নাম, ঠিকানা, জমির পরিমাণ, খতিয়ান নম্বর, দাগ নম্বর ইত্যাদি তথ্য সঠিক কিনা তা খতিয়ান, দাগ খতিয়ান, এবং সরকারি রেকর্ডের সাথে মিলিয়ে দেখুন।
  • দলিলে উল্লেখিত সাক্ষীদের নাম এবং ঠিকানা সঠিক কিনা তা যাচাই করুন।
৩. আইনি পরামর্শ নিন:
  • একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া জমির দলিলের বৈধতা নিশ্চিত করার সবচেয়ে নিরাপদ উপায়।
  • আইনজীবী দলিলের সকল দিক বিশ্লেষণ করে আপনাকে দলিলটি বৈধ কিনা তা জানাতে পারবেন।
৪. অনলাইন মাধ্যম ব্যবহার করুন:
  • সরকারের ভূমি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে গিয়ে জমির দলিলের তথ্য অনলাইনে যাচাই করতে পারেন।
  • কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও জমির দলিলের বৈধতা যাচাই করার সার্ভিস প্রদান করে।
৫. সতর্কতা অবলম্বন করুন:
  • দলিলের বৈধতা সম্পর্কে কোন সন্দেহ থাকলে দলিলটি ক্রয় করা থেকে বিরত থাকুন।
  • অসৎ ব্যক্তিদের প্রতারণার শিকার হতে সাবধান থাকুন।
  • জমি কেনার আগে জমির দলিলের বৈধতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উপরে উল্লেখিত পদক্ষেপগুলি অনুসরণ করে আপনি একটি জমির দলিল বৈধ কিনা তা নির্ধারণ করতে পারবেন।
আপনার জমির দলিল বৈধ কি না কিভাবে বুঝবেন?

জমির দলিল বৈধ কিনা তা বোঝার জন্য কিছু প্রশ্ন ও উত্তর

১) দলিলে কি সকল প্রয়োজনীয় তথ্য আছে?
দলিলে জমির মালিকের নাম, ঠিকানা, জমির পরিমাণ, খতিয়ান নম্বর, দাগ নম্বর, মৌজা, উপজেলা, জেলা স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে কিনা?
  • দলিলের সাক্ষীদের নাম, ঠিকানা স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে কিনা?
  • দলিলের স্বাক্ষর ও তারিখ স্পষ্টভাবে আছে কিনা?
২) দলিলের স্ট্যাম্প ও রেজিস্ট্রেশন
  • দলিলে সরকার নির্ধারিত স্ট্যাম্প ব্যবহার করা হয়েছে কিনা?
  • দলিলটি সঠিকভাবে রেজিস্ট্রি করা হয়েছে কিনা?
  • রেজিস্ট্রারের স্বাক্ষর ও তারিখ স্পষ্টভাবে আছে কিনা?
৩) দলিলের মালিকানার ধরণ
  • দলিলের মাধ্যমে মালিকানা কিভাবে অর্জিত হয়েছে (উত্তরাধিকার, ক্রয়, বিনিময়, দান ইত্যাদি)?
  • মালিকানার ধরণ কি (মালিকানা, দখল, ভাগচাষ ইত্যাদি)?
  • মালিকানার কোনো শর্ত বা বাধা আছে কিনা?
৪) জমির অবস্থা
  • জমি কি বাস্তবে বিদ্যমান?
  • জমির মালিকানা বিতর্কমুক্ত কিনা?
  • জমির উপর কোনো ঋণ বা বন্ধক আছে কিনা?
৫) আইনি পরামর্শ
জমির দলিল বৈধ কিনা তা নিশ্চিত করার জন্য একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া উচিত।

৬. দলিলের বয়স:
প্রশ্ন: কত বছরের পুরোনো দলিল বৈধ?
উত্তর: দলিলের বয়সের কোন নির্দিষ্ট সীমা নেই। তবে, ১৯৭৬ সালের আগের দলিলগুলো "পুরাতন দলিল" হিসেবে বিবেচিত হয় এবং বৈধতা যাচাইয়ের জন্য অতিরিক্ত যাচাই-বাছাই প্রয়োজন হতে পারে।

৭. দলিলের ধরন:
প্রশ্ন: কত ধরণের জমির দলিল আছে?
উত্তর: বাংলাদেশে 4 ধরণের জমির দলিল আছে:
  • দাগ নম্বর খতিয়ান
  • মৌজা খতিয়ান
  • সিএস খতিয়ান
  • আরএস খতিয়ান
৮. দলিলের মালিকানা:
প্রশ্ন: দলিলে একাধিক মালিকের নাম থাকলে কী করবেন?
উত্তর: সকল মালিকের সম্মতি ছাড়া জমি বিক্রি করা যাবে না। মালিকানা পরিবর্তনের জন্য সকলের স্বাক্ষর এবং সম্মতি প্রয়োজন।

৯. দলিলের মিউটেশন:
প্রশ্ন: মিউটেশন কী?
উত্তর: মিউটেশন হলো জমির মালিকানা পরিবর্তনের নথিভুক্তি প্রক্রিয়া। নতুন মালিকের নাম খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য মিউটেশন করা আবশ্যক।

১০. দলিলের জালিয়াতি:
প্রশ্ন: জাল দলিলের বৈশিষ্ট্যগুলো কী কী?
উত্তর: জাল দলিলে ভুল বানান, অস্পষ্ট তথ্য, মিথ্যা স্বাক্ষর, এবং অসঙ্গতিপূর্ণ তথ্য থাকতে পারে।

১১. দলিল যাচাই:
প্রশ্ন: জমির দলিল যাচাই করার সর্বোত্তম উপায় কী?
উত্তর: 
  • সাব-রেজিস্ট্রার অফিস: আপনি যেখানে জমি অবস্থিত সেখানকার সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে গিয়ে দলিলের মূল কপি এবং খতিয়ানের সাথে মিলিয়ে দেখতে পারেন।
  • ভূমি অফিস: যেখানে জমি অবস্থিত সেখানকার ভূমি অফিসে গিয়ে দলিলের তথ্য অনলাইনে যাচাই করতে পারেন।
  • আইনজীবীর পরামর্শ: একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া জমির দলিলের বৈধতা যাচাই করার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায়।
১২. দলিল সংক্রান্ত আইনি জটিলতা:
প্রশ্ন: জমির দলিল সংক্রান্ত আইনি জটিলতা সমাধানের জন্য কী করবেন?
উত্তর: জমির দলিল সংক্রান্ত আইনি জটিলতা সমাধানের জন্য একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর সাথে পরামর্শ করা উচিত।

উল্লেখ্য: এই তথ্যগুলো শুধুমাত্র সাধারণ ধারণার জন্য। জমির দলিলের বৈধতা যাচাই করার।
Read More...

শনিবার, ৪ জানুয়ারি, ২০২৫

আগামী - সুকান্ত ভট্টাচার্য

জড় নই, মৃত নই, নই অন্ধকারের খনিজ,
আমি তো জীবন্ত প্রাণ, আমি এক অঙ্কুরিত বীজ;
মাটিতে লালিত ভীরু, শুধু আজ আকাশের ডাকে
মেলেছি সন্দিগ্ধ চোখ, স্বপ্ন ঘিরে রয়েছে আমাকে।

যদিও নগণ্য আমি, তুচ্ছ বটবৃক্ষের সমাজে
তবু ক্ষুদ্র এ শরীরে গোপনে মর্মরধ্বনি বাজে,
বিদীর্ণ করেছি মাটি, দেখেছি আলোর আনাগোনা
শিকড়ে আমার তাই অরণ্যের বিশাল চেতনা।

আজ শুধু অঙ্কুরিত, জানি কাল ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পাতা
উদ্দাম হাওয়ার তালে তাল রেখে নেড়ে যাবে মাথা;
তার পর দৃপ্ত শাখা মেলে দেব সবার সম্মুখে,
ফোটাব বিস্মিত ফুল প্রতিবেশী গাছেদের মুখে।

সংহত কঠিন ঝড়ে দৃঢ়প্রাণ প্রত্যেক শিকড়;
শাখায় শাখায় বাঁধা, প্রত্যাহত হবে জানি ঝড়;
অঙ্কুরিত বন্ধু যত মাথা তুলে আমারই আহ্বানে
জানি তারা মুখরিত হবে নব অরণ্যের গানে।
আগামী বসন্তে জেনো মিশে যাব বৃহতের দলে;
জয়ধ্বনি কিশলয়ে; সম্বর্ধনা জানাবে সকলে।

ক্ষুদ্র আমি তুচ্ছ নই- জানি আমি ভাবী বনস্পতি,
বৃষ্টির, মাটির রসে পাই আমি তারি তো সম্মতি।
সেদিন ছায়ায় এসো; হানো যদি কঠিন কুঠারে
তবুও তোমায় আমি হাতছানি দেব বারে বারে;
ফল দেব, ফুল দেব, দেব আমি পাখিরও কূজন
একই মাটিতে পুষ্ট তোমাদের আপনার জন।।
Read More...

কবিতা নদী - জীবনানন্দ দাশ

রাইসর্ষের খেত সকালে উজ্জ্বল হলো- দুপুরে বিবর্ণ হ’য়ে গেল
তারি পাশে নদী;

নদী, তুমি কোন কথা কও?
অশ্বথের ডালাপালা তোমার বুকের ‘পরে পড়েছে যে, 
জামের ছায়ায় তুমি নীল হ’লে.
আরো দুরে চলে যাই
সেই শব্দ সেই শব্দ পিছে-পিছে আসে;
নদী না কি?

নদী, তুমি কোন কথা কও?

তুমি যেন আমার ছোট মেয়ে- আমার সে ছোটো মেয়ে :
যতদূর যাই আমি- হামাগুড়ি দিয়ে তুমি পিছে পিছে আসো,
তোমার ঢেউয়ের শব্দ শুনি আমি : আমারি নিজের শিশু সারাদিন নিজ মনে
কথা কয় (যেন)

কথা কয়- কথা কয়- ক্লান্ত হয় নাকো
এই নদী
একপাল মাছরাঙা নদীর বুকের রামধনু
বকের ডানার সারি শাদা পদ্ম- নিস্তব্ধ পদ্মের দ্বীপ নদীর ভিতরে
মানুষেরা সেই সব দেখে নাই।

কখন আমের বনে চলে গেছি
এইখানে কোকিলের ভালোবাসা কোকিলের সাথে,
এখানে হাওয়ায় যেন ভালোবাসা বীজ হ’য়ে আছে,
নদীর নতুন শব্দ এইখানে : কার যেন ভালোবাসা পুষে রাখে বুকে
সোনালি প্রেমের গল্প সারাদিন পাড়ে
সারাদিন পাখি তাহা শোনে; তবু শোনে সারাদিন?
পাখিরা তাদের গানে এই শব্দ তবু
পৃথিবীর খেতে মাঠে ছড়াতে পারে না,
নদীর নিজের সুর এ যে!

নদী, তুমি কোন কথা কও?

গাছ থেকে গাছে, আর, মাঠ থেকে রোদ শুধু শুধু মরে যায়
সব আলো কোন দিকে যায়!
নিজের মুখের থেকে রোদের সোনালি রেণু মুছে ফ্যালে নদী
শুধু তার ফুল নিয়ে খেলিবার সাধ
ফুলের মতন কোন ভালোবাসা নিয়ে,
ধানের কঠিন খোসা- খড়- হিম- শুকনো সব পাপড়ির মাঝে সেই
মেয়ে ইস্ততত বসে আছে;
গান গায়;
নদীর- নদীর শব্দ শুনি আমি।

নদী তুমি কোন কথা কও!
Read More...

কান্ডারী হুশিয়ার - কাজী নজরুল ইসলাম

দুর্গম গিরি, কান্তার-মরু, দুস্তর পারাবার
লঙ্ঘিতে হবে রাত্রি-নিশীথে, যাত্রীরা হুশিয়ার!
 
দুলিতেছে তরি, ফুলিতেছে জল, ভুলিতেছে মাঝি পথ,
ছিঁড়িয়াছে পাল, কে ধরিবে হাল, আছে কার হিম্মৎ?
কে আছ জোয়ান হও আগুয়ান হাঁকিছে ভবিষ্যৎ।
এ তুফান ভারী, দিতে হবে পাড়ি, নিতে হবে তরী পার।
 
তিমির রাত্রি, মাতৃমন্ত্রী সান্ত্রীরা সাবধান!
যুগ-যুগান্ত সঞ্চিত ব্যথা ঘোষিয়াছে অভিযান।
ফেনাইয়া উঠে বঞ্চিত বুকে পুঞ্জিত অভিমান,
ইহাদের পথে নিতে হবে সাথে, দিতে হবে অধিকার।
 
অসহায় জাতি মরিছে ডুবিয়া, জানে না সন্তরন
কান্ডারী! আজ দেখিব তোমার মাতৃমুক্তি পন।
হিন্দু না ওরা মুসলিম? ওই জিজ্ঞাসে কোন জন?
কান্ডারী! বল, ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মার
 
গিরি সংকট, ভীরু যাত্রীরা গুরু গরজায় বাজ,
পশ্চাৎ-পথ-যাত্রীর মনে সন্দেহ জাগে আজ!
কান্ডারী! তুমি ভুলিবে কি পথ? ত্যজিবে কি পথ-মাঝ?
করে হানাহানি, তবু চলো টানি, নিয়াছ যে মহাভার!
 
কান্ডারী! তব সম্মুখে ঐ পলাশীর প্রান্তর,
বাঙালীর খুনে লাল হল যেথা ক্লাইভের খঞ্জর!
ঐ গঙ্গায় ডুবিয়াছে হায়, ভারতের দিবাকর!
উদিবে সে রবি আমাদেরি খুনে রাঙিয়া পূনর্বার।
 
ফাঁসির মঞ্চে গেয়ে গেল যারা জীবনের জয়গান,
আসি অলক্ষ্যে দাঁড়ায়েছে তারা, দিবে কোন্ বলিদান
আজি পরীক্ষা, জাতির অথবা জাতের করিবে ত্রাণ?
দুলিতেছে তরী, ফুলিতেছে জল, কান্ডারী হুশিয়ার!
Read More...

দারিদ্র্য - কাজী নজরুল ইসলাম

হে দারিদ্র্য, তুমি মোরে করেছ মহান্‌।
তুমি মোরে দানিয়াছ খ্রীষ্টের সম্মান
কন্টক-মুকুট শোভা।-দিয়াছ, তাপস,
অসঙ্কোচ প্রকাশের দুরন্ত সাহস;
উদ্ধত উলঙ্গ দৃষ্টি, বাণী ক্ষুরধার,
বীণা মোর শাপে তব হ’ল তরবার!
দুঃসহ দাহনে তব হে দর্পী তাপস,
অম্লান স্বর্ণেরে মোর করিলে বিরস,
অকালে শুকালে মোর রূপ রস প্রাণ!
শীর্ণ করপুট ভরি’ সুন্দরের দান
যতবার নিতে যাই-হে বুভুক্ষু তুমি
অগ্রে আসি’ কর পান! শূন্য মরুভূমি
হেরি মম কল্পলোক। আমার নয়ন
আমারি সুন্দরে করে অগ্নি বরিষণ!

বেদনা-হলুদ-বৃন্ত কামনা আমার
শেফালির মত শুভ্র সুরভি-বিথার
বিকশি’ উঠিতে চাহে, তুমি হে নির্মম,
দলবৃন্ত ভাঙ শাখা কাঠুরিয়া সম!
আশ্বিনের প্রভাতের মত ছলছল
ক’রে ওঠে সারা হিয়া, শিশির সজল

টলটল ধরণীর মত করুণায়!
তুমি রবি, তব তাপে শুকাইয়া যায়
করুণা-নীহার-বিন্দু! ম্লান হ’য়ে উঠি
ধরণীর ছায়াঞ্চলে! স্বপ্ন যায় টুটি’
সুন্দরের, কল্যাণের। তরল গরল
কন্ঠে ঢালি’ তুমি বল, ‘অমৃতে কি ফল?
জ্বালা নাই, নেশা নাই. নাই উন্মাদনা,-
রে দুর্বল, অমরার অমৃত-সাধনা
এ দুঃখের পৃথিবীতে তোর ব্রত নহে,
তুই নাগ, জন্ম তোর বেদনার দহে।
কাঁটা-কুঞ্জে বসি’ তুই গাঁথিবি মালিকা,
দিয়া গেনু ভালে তোর বেদনার টিকা!….
গাহি গান, গাঁথি মালা, কন্ঠ করে জ্বালা,
দংশিল সর্বাঙ্গে মোর নাগ-নাগবালা!….

ভিক্ষা-ঝুলি নিয়া ফের’ দ্বারে দ্বারে ঋষি
ক্ষমাহীন হে দুর্বাসা! যাপিতেছে নিশি
সুখে রব-বধূ যথা-সেখানে কখন,
হে কঠোর-কন্ঠ, গিয়া ডাক-‘মূঢ়, শোন্‌,
ধরণী বিলাস-কুঞ্জ নহে নহে কারো,
অভাব বিরহ আছে, আছে দুঃখ আরো,
আছে কাঁটা শয্যাতলে বাহুতে প্রিয়ার,
তাই এবে কর্‌ ভোগ!-পড়ে হাহাকার
নিমেষে সে সুখ-স্বর্গে, নিবে যায় বাতি,
কাটিতে চাহে না যেন আর কাল-রাতি!
চল-পথে অনশন-ক্লিষ্ট ক্ষীণ তনু,
কী দেখি’ বাঁকিয়া ওঠে সহসা ভ্রূ-ধনু,
দু’নয়ন ভরি’ রুদ্র হানো অগ্নি-বাণ,
আসে রাজ্যে মহামারী দুর্ভিক্ষ তুফান,
প্রমোদ-কানন পুড়ে, উড়ে অট্টালিকা,-
তোমার আইনে শুধু মৃত্যু-দন্ড লিখা!

বিনয়ের ব্যভিচার নাহি তব পাশ,
তুমি চান নগ্নতার উলঙ্গ প্রকাশ।
সঙ্কোচ শরম বলি’ জান না ক’ কিছু,
উন্নত করিছ শির যার মাথা নীচু।
মৃত্যু-পথ-যাত্রীদল তোমার ইঙ্গিতে
গলায় পরিছে ফাঁসি হাসিতে হাসিতে!
নিত্য অভাবের কুন্ড জ্বালাইয়া বুকে
সাধিতেছ মৃত্যু-যজ্ঞ পৈশাচিক সুখে!
লক্ষ্মীর কিরীটি ধরি, ফেলিতেছ টানি’
ধূলিতলে। বীণা-তারে করাঘাত হানি’
সারদার, কী সুর বাজাতে চাহ গুণী?
যত সুর আর্তনাদ হ’য়ে ওঠে শুনি!
প্রভাতে উঠিয়া কালি শুনিনু, সানাই
বাজিছে করুণ সুরে! যেন আসে নাই
আজো কা’রা ঘরে ফিরে! কাঁদিয়া কাঁদিয়া
ডাকিছে তাদেরে যেন ঘরে ‘সানাইয়া’!
বধূদের প্রাণ আজ সানা’য়ের সুরে
ভেসে যায় যথা আজ প্রিয়তম দূরে
আসি আসি করিতেছে! সখী বলে, ‘বল্‌
মুছিলি কেন লা আঁখি, মুছিলি কাজল?….

শুনিতেছি আজো আমি প্রাতে উঠিয়াই
‘ আয় আয়’ কাঁদিতেছে তেমনি সানাই।
ম্লানমুখী শেফালিকা পড়িতেছে ঝরি’
বিধবার হাসি সম-স্নিগ্ধ গন্ধে ভরি’!
নেচে ফেরে প্রজাপতি চঞ্চল পাখায়
দুরন্ত নেশায় আজি, পুষ্প-প্রগল্‌ভায়
চুম্বনে বিবশ করি’! ভোমোরার পাখা
পরাগে হলুদ আজি, অঙ্গে মধু মাখা।

উছলি’ উঠিছে যেন দিকে দিকে প্রাণ!
আপনার অগোচরে গেয়ে উঠি গান
আগমনী আনন্দের! অকারণে আঁখি
পু’রে আসে অশ্রু-জলে! মিলনের রাখী
কে যেন বাঁধিয়া দেয় ধরণীর সাথে!
পুষ্পঞ্জলি ভরি’ দু’টি মাটি মাখা হাতে
ধরণী এগিয়ে আসে, দেয় উপহার।
ও যেন কনিষ্ঠা মেয়ে দুলালী আমার!-
সহসা চমকি’ উঠি! হায় মোর শিশু
জাগিয়া কাঁদিছ ঘরে, খাওনি ক’ কিছু
কালি হ’তে সারাদিন তাপস নিষ্ঠুর,
কাঁদ’ মোর ঘরে নিত্য তুমি ক্ষুধাতুর!

পারি নাই বাছা মোর, হে প্রিয় আমার,
দুই বিন্দু দুগ্ধ দিতে!-মোর অধিকার
আনন্দের নাহি নাহি! দারিদ্র্য অসহ
পুত্র হ’য়ে জায়া হয়ে কাঁদে অহরহ
আমার দুয়ার ধরি! কে বাজাবে বাঁশি?
কোথা পাব আনন্দিত সুন্দরের হাসি?
কোথা পাব পুষ্পাসব?-ধুতুরা-গেলাস
ভরিয়া করেছি পান নয়ন-নির্যাস!….
আজো শুনি আগমনী গাহিছে সানাই,
ও যেন কাঁদিছে শুধু-নাই কিছু নাই!
Read More...

বিদায় - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও।
তারি রথ নিত্যই উধাও
জাগাইছে অন্তরীক্ষে হৃদয়স্পন্দন,
চক্রে-পিষ্ট আঁধারের বক্ষফাটা তারার ক্রন্দন।

ওগো বন্ধু,
সেই ধাবমান কাল
জড়ায়ে ধরিল মোরে ফেরি তার জাল
তুলে নিল দ্রুতরথে
দুঃসাহসী ভ্রমণের পথে
তোমা হতে বহু দূরে।
মনে হয়, অজস্র মৃত্যুরে
পার হয়ে আসিলাম
আজি নবপ্রভাতের শিখরচূড়ায়–
রথের চঞ্চল বেগ হাওয়ায় উড়ায়
আমার পুরানো নাম।
ফিরিবার পথ নাহি;
দূর হতে যদি দেখ চাহি
পারিবে না চিনিতে আমায়।
হে বন্ধু, বিদায়।

কোনোদিন কর্মহীন পূর্ণ অবকাশে বসন্তবাতাসে
অতীতের তীর হতে যে রাত্রে বহিবে দীর্ঘশ্বাস,
ঝরা বকুলের কান্না ব্যথিবে আকাশ,
সেই ক্ষণে খুঁজে দেখো–কিছু মোর পিছে রহিল সে
তোমার প্রাণের প্রান্তে; বিস্মৃতিপ্রদোষে হয়তো দিবে সে জ্যোতি,
হয়তো ধরিবে কভু নাম-হারা স্বপ্নের মুরতি।
তবু সে তো স্বপ্ন নয়,
সব-চেয়ে সত্য মোর, সেই মৃত্যুঞ্জয়,
সে আমার প্রেম।

তারে আমি রাখিয়া এলেম
অপরিবর্তন অর্ঘ্য তোমার উদ্দেশে।
পরিবর্তনের স্রোতে আমি যাই ভেসে
কালের যাত্রায়। হে বন্ধু, বিদায়।

তোমার হয় নি কোনো ক্ষতি
মর্তের মৃত্তিকা মোর, তাই দিয়ে অমৃতমুরতি
যদি সৃষ্টি করে থাক, তাহারি আরতি
হোক তব সন্ধ্যাবেলা,
পূজার সে খেলা
ব্যাঘাত পাবে না মোর প্রত্যহের ম্লান স্পর্শ লেগে;
তৃষার্ত আবেগ-বেগে
ভ্রষ্ট নাহি হবে তার কোনো ফুল নৈবেদ্যের থালে।
তোমার মানস-ভোজে সযত্নে সাজালে
যে ভাবরসের পাত্র বাণীর তৃষায়,
তার সাথে দিব না মিশায়ে
যা মোর ধূলির ধন, যা মোর চক্ষের জলে ভিজে।

আজো তুমি নিজে হয়তো-বা করিবে রচন
মোর স্মৃতিটুকু দিয়ে স্বপ্নাবিষ্ট তোমার বচন।
ভার তার না রহিবে, না রহিবে দায়।
হে বন্ধু, বিদায়।

মোর লাগি করিয়ো না শোক,
আমার রয়েছে কর্ম, আমার রয়েছে বিশ্বলোক।
মোর পাত্র রিক্ত হয় নাই–
শূন্যেরে করিব পূর্ণ, এই ব্রত বহিব সদাই।
উৎকণ্ঠ আমার লাগি কেহ যদি প্রতীক্ষিয়া থাকে
সেই ধন্য করিবে আমাকে।
শুক্লপক্ষ হতে আনি
রজনীগন্ধার বৃন্তখানি
যে পারে সাজাতে
অর্ঘ্যথালা কৃষ্ণপক্ষ রাতে,
যে আমারে দেখিবারে পায়
অসীম ক্ষমায়
ভালো মন্দ মিলায়ে সকলি,
এবার পূজায় তারি আপনারে দিতে চাই বলি।

তোমারে যা দিয়েছিনু তার
পেয়েছ নিঃশেষ অধিকার।
হেথা মোর তিলে তিলে দান,
করুণ মুহূর্তগুলি গণ্ডূষ ভরিয়া করে পান
হৃদয়-অঞ্জলি হতে মম।
ওগো তুমি নিরুপম,
হে ঐশ্বর্যবান,
তোমারে যা দিয়েছিনু সে তোমারি দান–
গ্রহণ করেছ যত ঋণী তত করেছ আমায়।
হে বন্ধু, বিদায়।
Read More...

কেউ কথা রাখেনি – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

কেউ কথা রাখেনি, তেত্রিশ বছর কাটলো কেউ কথা রাখেনি
ছেলেবেলায় এক বোষ্টুমি তার আগমনী গান হঠাৎ থামিয়ে বলেছিলো
শুক্লা দ্বাদশীর দিন অন্তরাটুকু শুনিয়ে যাবে
তারপর কত চন্দ্রভুক অমবস্যা এসে চলে গেল, 
কিন্তু সেই বোষ্টুমি আর এলো না
পঁচিশ বছর প্রতীক্ষায় আছি ।

মামাবাড়ির মাঝি নাদের আলী বলেছিল, বড় হও দাদাঠাকুর
তোমাকে আমি তিন প্রহরের বিল দেখাতে নিয়ে যাবো
সেখানে পদ্মফুলের মাথায় সাপ আর ভ্রমর খেলা করে !
নাদের আলি, আমি আর কত বড় হবো ? আমার মাথা এই ঘরের ছাদ
ফুঁরে আকাশ স্পর্শ করলে তারপর তুমি আমায় তিন প্রহরের বিল দেখাবে ?

একটাও রয়্যাল গুলি কিনতে পারিনি কখনো
লাঠি-লজেন্স দেখিয়ে দেখিয়ে চুষেছে লস্কর বাড়ির ছেলেরা
ভিখারীর মতন চৌধুরীদের গেটে দাঁড়িয়ে দেখেছি ভেতরে রাস উৎসব
অবিরল রঙ্গের ধারার মধ্যে সুবর্ণ কঙ্কণ পড়া ফর্সা রমণীরা কতরকম আমোদে হেসেছে
আমার দিকে তারা ফিরেও চায়নি !
বাবা আমার কাঁধ ছুঁয়ে বলেছিলেন, দেখিস, একদিন আমরাও…
বাবা এখন অন্ধ, আমাদের দেখা হয়নি কিছুই
সেই রয়্যাল গুলি, সেই লাঠি-লজেন্স, সেই রাস উৎসব
আমায় কেউ ফিরিয়ে দেবে না !

বুকের মধ্যে সুগন্ধি রুমাল রেখে বরুণা বলেছিল,
যেদিন আমায় সত্যিকারের ভালবাসবে
সেদিন আমার বুকেও এরকম আতরের গন্ধ হবে !
ভালবাসার জন্য আমি হাতের মুঠোয় প্রাণ নিয়েছি
দুরন্ত ষাঁড়ের চোখে বেঁধেছি লাল কাপড়
বিশ্ব সংসার তন্ন তন্ন করে খুঁজে এনেছি ১০৮ টি নীলপদ্ম
তবু কথা রাখেনি বরুণা, এখন তার বুকে শুধুই মাংসের গন্ধ
এখনো সে যে কোন নারী !
কেউ কথা রাখেনি, তেত্রিশ বছর কাটলো, কেউ কথা রাখেনা !
Read More...

নূরলদীনের সারাজীবন - সৈয়দ শামসুল হক

নিলক্ষা আকাশ নীল, হাজার হাজার তারা ঐ নীলে অগণিত আর
নিচে গ্রাম, গঞ্জ, হাট, জনপদ, লোকালয় আছে ঊনসত্তর হাজার।
ধবলদুধের মতো জ্যোৎস্না তার ঢালিতেছে চাঁদ – পূর্ণিমার।
নষ্ট খেত, নষ্ট মাঠ, নদী নষ্ট, বীজ নষ্ট, বড় নষ্ট যখন সংসার
তখন হঠাৎ কেন দেখা দেয় নিলক্ষার নীলে তীব্র শিস
দিয়ে এত বড় চাঁদ?

অতি অকস্মাৎ
স্তব্ধতার দেহ ছিঁড়ে কোন ধ্বনি? কোন শব্দ? কিসের প্রপাত?
গোল হয়ে আসুন সকলে,
ঘন হয়ে আসুন সকলে,
আমার মিনতি আজ স্থির হয়ে বসুন সকলে।
অতীত হঠাৎ হাতে হানা দেয় মরা আঙিনায়।
নূরলদীনের বাড়ি রংপুরে যে ছিল,
রংপুরে নূরলদীন একদিন ডাক দিয়েছিল
১১৮৯ সনে।

আবার বাংলার বুঝি পড়ে যায় মনে,
নূরলদীনের কথা মনে পড়ে যায়
যখন শকুন নেমে আসে এই সোনার বাংলায়;
নূরলদীনের কথা মনে পড়ে যায়
যখন আমার দেশ ছেয়ে যায় দালালেরই আলখাল্লায়;
নূরলদীনের কথা মনে পড়ে যায়
যখন আমার স্বপ্ন লুট হয়ে যায়;
নূরলদীনের কথা মনে পড়ে যায়
যখন আমার কণ্ঠ বাজেয়াপ্ত করে নিয়ে যায়;
নূরলদীনের কথা মনে পড়ে যায়
যখন আমারই দেশে এ আমার দেহ থেকে রক্ত ঝরে যায়
ইতিহাসে, প্রতিটি পৃষ্ঠায়।

আসুন, আসুন তবে, আজ এই প্রশস্ত প্রান্তরে;
যখন স্মৃতির দুধ জ্যোৎস্নার সাথে ঝরে পড়ে,
তখন কে থাকে ঘুমে? কে থাকে ভেতরে?
কে একা নিঃসঙ্গ বসে অশ্রুপাত করে?
সমস্ত নদীর অশ্রু অবশেষে ব্রহ্মপূত্রে মেশে।

নূরলদীনের কথা যেন সারা দেশে
পাহাড়ী ঢলের মতো নেমে এসে সমস্ত ভাসায়,
অভাগা মানুষ যেন জেগে ওঠে আবার এ আশায়
যে, আবার নূরলদীন একদিন আসিবে বাংলায়,
আবার নূরলদীন একদিন কাল পূর্ণিমায়
দিবে ডাক,”জাগো, বাহে, কোনঠে সবায়?
Read More...

বাতাসে লাশের গন্ধ – রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ

আজো আমি বাতাসে লাশের গন্ধ পাই
আজো আমি মাটিতে মৃত্যুর নগ্ননৃত্য দেখি
ধর্ষিতার কাতর চিৎকার শুনি আজো আমি তন্দ্রার ভেতরে...
এ দেশ কি ভুলে গেছে সোই দুঃস্বপ্নের রাত, সেই রক্তাক্ত সময় ?

বাতাসে লাশের গন্ধ ভাসে
মাটিতে লেগে আছে রক্তের দাগ ।
এই রক্তমাখা মাটির ললাট ছুঁয়ে একদিন যারা বুক বেঁধে ছিলো ।
জীর্ণ জীবনের পুঁজে তারা খুঁজে নেয় নিষিদ্ধ আঁধার ,
আজ তারা আলোহিন খাঁচা ভালোবেসে জেগে থাকে রাত্রির গুহায় ।
এ যেন নষ্ট জন্মের লজ্জার আড়ষ্ট কুমারী জননী,
স্বাধীনতা-- একি হবে নষ্ট জন্ম ?
একি তবে পিতাহীন জননীর লজ্জার ফসল ?
জাতির পতাকা আজ খামছে ধরেছে সেই পুরোনো শকুন ।
বাতাসে লাশের গন্ধ
নিয়ন আলোয় তবু নর্তকীর দেহে দোলে মাংশের তুফান ।
মাটিতে রক্তের দাগ--
চালের গুদামে তবু জমা হয় অনাহারী মানুষের হাড় ।
এ চোখে ঘুম আসেনা । সারারাত আমার ঘুম আসে না-

তন্দ্রার ভেতর আমি শুনি ধর্ষিতার করুণ চিৎকার,
নদীতে পানার মতো ভেসে থাকা মানুষের পচালাশ
মুন্ডুহীন বালিকার কুকুরে খাওয়া বীভৎস শরীর
ভেসে ওঠে চোখের ভেতরে- আমি ঘুমুতে পারিনা, আমি
ঘুমুতে পারিনা...

রক্তের কাফনে মোড়া - কুকুরে খেয়েছে যারে, শকুনে খেয়েছে যারে
সে আমার ভাই, সে আমার মা, সে আমার প্রিয়তম পিতা ।
স্বাধীনতা, সে- আমার স্বজন- হারিয়ে পাওয়া একমাত্র স্বজন-
স্বাধীনতা- আমার প্রিয় মানুষের রক্তের কেনা অমূল্য ফসল ।
ধর্ষিতা বোনের শাড়ী ওই আমার রক্তাক্ত পতাকা ।
Read More...

কবিতা বনলতা সেন – জীবনানন্দ দাশ

হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে,
সিংহল সমুদ্র থেকে আরো দূর অন্ধকারে মালয় সাগরে
অনেক ঘুরেছি আমি; বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগতে
সেখানে ছিলাম আমি; আরো দূর অন্ধকার বিদর্ভ নগরে;
আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন,
আমারে দুদণ্ড শান্তি দিয়েছিল নাটোরের বনলতা সেন।

চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা,
মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য; অতিদূর সমুদ্রের’পর
হাল ভেঙ্গে যে নাবিক হারায়েছে দিশা
সবুজ ঘাসের দেশ যখন সে চোখে দেখে দারুচিনি-দ্বীপের ভিতর,
তেমনই দেখেছি তারে অন্ধকারে; বলেছে সে, ‘এতোদিন কোথায় ছিলেন?’
পাখির নীড়ের মত চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন।

সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন
সন্ধ্যা আসে; ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল;
পৃথিবীর সব রঙ মুছে গেলে পাণ্ডুলিপি করে আয়োজন,
তখন গল্পের তরে জোনাকির রঙে ঝিলমিল।
সব পাখি ঘরে আসে — সব নদী; ফুরায় এ-জীবনের সব লেনদেন;
থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।
Read More...

শুক্রবার, ৩ জানুয়ারি, ২০২৫

কবিতা দারিদ্র্য রেখা - তারাপদ রায়

আমি নিতান্ত গরীব ছিলাম, খুবই গরীব।
আমার ক্ষুধার অন্ন ছিল না,
আমার লজ্জা নিবারণের কাপড় ছিল না,
আমার মাথার উপরে আচ্ছাদন ছিল না।
অসীম দয়ার শরীর আপনার,
আপনি এসে আমাকে বললেন,
না, গরীব কথাটা খুব খারাপ,
ওতে মানুষের মর্যাদা হানি হয়,
তুমি আসলে দরিদ্র।

অপরিসীম দারিদ্র্যের মধ্যে আমারকষ্টের দিন,
আমার কষ্টের দিন, দিনের পর দিন আরশেষ হয় না,
আমি আরো জীর্ণ আরো ক্লিষ্ট হয়ে গেলাম।
হঠাৎ আপনি আবার এলেন, এসে বললেন,
দ্যাখো, বিবেচনা করে দেখলাম,
দরিদ্র শব্দটিও ভালো নয়, তুমি হলে নিঃস্ব।

দীর্ঘ নিঃস্বতায় আমার দিন রাত্রি,
গনগনে গরমে ধুঁকতে ধুঁকতে,
শীতের রাতের ঠাণ্ডায় কাঁপতে কাঁপতে,
বর্ষার জলে ভিজতে ভিজতে,
আমি নিঃস্ব থেকে নিঃস্বতর হয়ে গেলাম।
আপনার কিন্তু ক্লান্তি নেই,
আপনি আবার এলেন, আপনি বললেন,
তোমার নিঃস্বতার কোনো মানে হয় না,
তুমি নিঃস্ব হবে কেন,
তোমাকে চিরকাল শুধু বঞ্চনা করা হয়েছে,
তুমি বঞ্চিত, তুমি চিরবঞ্চিত।

আমার বঞ্চনার অবসান নেই,
বছরের পর বছর আধপেটা খেয়ে,
উদোম আকাশের নিচে রাস্তায় শুয়ে,
কঙ্কালসার আমার বেঁচে থাকা।
কিন্তু আপনি আমাকে ভোলেননি,
এবার আপনার মুষ্টিবদ্ধ হাত,
আপনি এসে উদাত্ত কণ্ঠে ডাক দিলেন,
জাগো, জাগো সর্বহারা।

তখন আর আমার জাগবার ক্ষমতা নেই,
ক্ষুধায় অনাহারে আমি শেষ হয়ে এসেছি,
আমার বুকের পাঁজর হাঁপরের মতো ওঠানামা করছে,
আপনার উৎসাহ ও উদ্দীপনার সঙ্গে
আমি তাল মেলাতে পারছি না।
ইতিমধ্যে আরো বহুদিন গিয়েছে,
আপনি এখন আরো বুদ্ধিমান,
আরো চৌকস হয়েছেন।

এবার আপনি একটি ব্ল্যাকবোর্ড নিয়ে এসেছেন,
সেখানে চকখড়ি দিয়ে যত্ন করে
একটা ঝকঝকে লম্বা লাইন টেনে দিয়েছেন।
এবার বড় পরিশ্রম হয়েছে আপনার,
কপালের ঘাম মুছে আমাকে বলেছেন,
এই যে রেখা দেখছো, এর নিচে,
অনেক নিচে তুমি রয়েছো।

চমৎকার!
আপনাকে ধন্যবাদ, বহু ধন্যবাদ!
আমার গরীবপনার জন্যে আপনাকে ধন্যবাদ,
আমার দারিদ্র্যের জন্যে আপনাকে ধন্যবাদ,
আমার নিঃস্বতার জন্যে আপনাকে ধন্যবাদ,
আমার বঞ্চনার জন্যে আপনাকে ধন্যবাদ,
আমার সর্বহারাত্বের জন্যে আপনাকে ধন্যবাদ,
আর সবশেষে ওই ঝকঝকে লম্বা রেখাটি,
ওই উজ্জ্বল উপহারটির জন্যে আপনাকে ধন্যবাদ।

কিন্তু, ক্রমশ,
আমার ক্ষুধার অন্ন এখন আরো কমে গেছে,
আমার লজ্জা নিবারণের কাপড় এখন আরো ছিঁড়ে গেছে,
আমার মাথার ওপরের আচ্ছাদন আরো সরে গেছে।
কিন্তু ধন্যবাদ,
হে প্রগাঢ় হিতৈষী, আপনাকে বহু ধন্যবাদ!
Read More...

কবিতা কেউ কি এখন - শামসুর রাহমান

কেউ কি এখন এই অবেলায়
আমার প্রতি বাড়িয়ে দেবে হাত?
আমার স্মৃতির ঝোপেঝাড়ে
হরিণ কাঁদে অন্ধকারে,
এখন আমার বুকের ভেতর
শুকনো পাতা, বিষের মতো রাত।
দ্বিধান্বিত দাঁড়িয়ে আছি
একটি সাঁকোর কাছাকাছি,
চোখ ফেরাতেই দেখি সাঁকো
এক নিমেষে ভাঙলো অকস্মাৎ।

গৃহে প্রবেশ করবো সুখে?
চৌকাঠে যায় কপাল ঠুকে।
বাইরে থাকি নত মুখে,
নেকড়েগুলো দেখায় তীক্ষè দাঁত।
অপরাহ্ণে ভালোবাসা
চক্ষে নিয়ে গহন ভাষা
গান শোনালো সর্বনাশা,
এই কি তবে মোহন অপঘাত?
কেউ কি এখন এই অবেলায়
আমার প্রতি বাড়িয়ে দেবে হাত?
Read More...

কবিতা যাতায়াত - হেলাল হাফিজ

কেউ জানে না আমার কেন এমন হলো।
কেন আমার দিন কাটে না রাত কাটে না
রাত কাটে তো ভোর দেখি না
কেন আমার হাতের মাঝে হাত থাকে না কেউ জানেনা।

নষ্ট রাখীর কষ্ট নিয়ে অতোটা পথ একলা এলাম
পেছন থেকে কেউ বলেনি করুণ পথিক
দুপুর রোদে গাছের নিচে একটু বসে জিরিয়ে নিও,
কেই বলেনি ভালো থেকো সুখেই থেকো
যুগল চোখে জলের ভাষায় আসার সময় কেউ বলেনি মাথার কসম আবার এসো..

জন্মাবধি ভেতরে এক রঙিন পাখি কেঁদেই গেলো
শুনলো না কেউ ধ্রুপদী ডাক,
চৈত্রাগুনে জ্বলে গেলো আমার বুকের গেরস্থালি
বললো না কেউ তরুন তাপস এই নে চারু শীতল কলস।
লন্ডভন্ড হয়ে গেলাম তবু এলাম।

ক্যাঙ্গারু তার শাবক নিয়ে যেমন করে বিপদ পেরোয়
আমিও ঠিক তেমনি করে সভ্যতা আর
শুভ্রতাকে বুকে নিয়েই দুঃসময়ে এতোটা পথ
একলা এলাম শুশ্রূষাহীন।
কেউ ডাকেনি তবু এলাম, বলতে এলাম ভালোবাসি।
Read More...

কবিতা বিদ্রোহী - কাজী নজরুল ইসলাম

বল বীর –
বল উন্নত মম শির!
শির নেহারি’ আমারি নতশির ওই শিখর হিমাদ্রির!
বল বীর –
বল মহাবিশ্বের মহাকাশ ফাড়ি’
চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারা ছাড়ি’
ভূলোক দ্যুলোক গোলক ভেদিয়া
খোদার আসন ‘আরশ’ ছেদিয়া,
উঠিয়াছি চির-বিস্ময় আমি বিশ্ববিধাতৃর!
মম ললাটে রুদ্র ভগবান জ্বলে রাজ-রাজটীকা দীপ্ত জয়শ্রীর!
বল বীর –
আমি চির উন্নত শির!

আমি চিরদূর্দম, দুর্বিনীত, নৃশংস,
মহা- প্রলয়ের আমি নটরাজ, আমি সাইক্লোন, আমি ধ্বংস!
আমি মহাভয়, আমি অভিশাপ পৃথ্বীর,
আমি দুর্বার,
আমি ভেঙে করি সব চুরমার!
আমি অনিয়ম উচ্ছৃঙ্খল,
আমি দ’লে যাই যত বন্ধন, যত নিয়ম কানুন শৃঙ্খল!
আমি মানি না কো কোন আইন,
আমি ভরা-তরী করি ভরা-ডুবি, আমি টর্পেডো, আমি ভীম ভাসমান মাইন!
আমি ধূর্জটি, আমি এলোকেশে ঝড় অকাল-বৈশাখীর
আমি বিদ্রোহী, আমি বিদ্রোহী-সুত বিশ্ব-বিধাতৃর!
বল বীর –
চির-উন্নত মম শির!

আমি ঝন্ঝা, আমি ঘূর্ণি,
আমি পথ-সমূখে যাহা পাই যাই চূর্ণি’।
আমি নৃত্য-পাগল ছন্দ,
আমি আপনার তালে নেচে যাই, আমি মুক্ত জীবনানন্দ।
আমি হাম্বার, আমি ছায়ানট, আমি হিন্দোল,
আমি চল-চঞ্চল, ঠমকি’ ছমকি’
পথে যেতে যেতে চকিতে চমকি’
ফিং দিয়া দিই তিন দোল;
আমি চপলা-চপল হিন্দোল।
আমি তাই করি ভাই যখন চাহে এ মন যা,
করি শত্রুর সাথে গলাগলি, ধরি মৃত্যুর সাথে পান্জা,
আমি উন্মাদ, আমি ঝন্ঝা!
আমি মহামারী আমি ভীতি এ ধরিত্রীর;
আমি শাসন-ত্রাসন, সংহার আমি উষ্ন চির-অধীর!
বল বীর –
আমি চির উন্নত শির!

আমি চির-দুরন্ত দুর্মদ,
আমি দুর্দম, মম প্রাণের পেয়ালা হর্দম হ্যায় হর্দম ভরপুর মদ।

আমি হোম-শিখা, আমি সাগ্নিক জমদগ্নি,
আমি যজ্ঞ, আমি পুরোহিত, আমি অগ্নি।
আমি সৃষ্টি, আমি ধ্বংস, আমি লোকালয়, আমি শ্মশান,
আমি অবসান, নিশাবসান।
আমি ইন্দ্রাণী-সুত হাতে চাঁদ ভালে সূর্য
মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী আর রণ-তূর্য;
আমি কৃষ্ন-কন্ঠ, মন্থন-বিষ পিয়া ব্যথা-বারিধীর।
আমি ব্যোমকেশ, ধরি বন্ধন-হারা ধারা গঙ্গোত্রীর।
বল বীর –
চির – উন্নত মম শির!

আমি সন্ন্যাসী, সুর-সৈনিক,
আমি যুবরাজ, মম রাজবেশ ম্লান গৈরিক।
আমি বেদুঈন, আমি চেঙ্গিস,
আমি আপনারে ছাড়া করি না কাহারে কুর্ণিশ!
আমি বজ্র, আমি ঈশান-বিষাণে ওঙ্কার,
আমি ইস্রাফিলের শিঙ্গার মহা হুঙ্কার,
আমি পিণাক-পাণির ডমরু ত্রিশূল, ধর্মরাজের দন্ড,
আমি চক্র ও মহা শঙ্খ, আমি প্রণব-নাদ প্রচন্ড!
আমি ক্ষ্যাপা দুর্বাসা, বিশ্বামিত্র-শিষ্য,
আমি দাবানল-দাহ, দাহন করিব বিশ্ব।
আমি প্রাণ খোলা হাসি উল্লাস, – আমি সৃষ্টি-বৈরী মহাত্রাস,
আমি মহা প্রলয়ের দ্বাদশ রবির রাহু গ্রাস!
আমি কভূ প্রশান্ত কভূ অশান্ত দারুণ স্বেচ্ছাচারী,
আমি অরুণ খুনের তরুণ, আমি বিধির দর্পহারী!
আমি প্রভোন্জনের উচ্ছ্বাস, আমি বারিধির মহা কল্লোল,
আমি উদ্জ্বল, আমি প্রোজ্জ্জ্বল,
আমি উচ্ছ্বল জল-ছল-ছল, চল-ঊর্মির হিন্দোল-দোল!

আমি বন্ধন-হারা কুমারীর বেণু, তন্বী-নয়নে বহ্ণি
আমি ষোড়শীর হৃদি-সরসিজ প্রেম উদ্দাম, আমি ধন্যি!
আমি উন্মন মন উদাসীর,
আমি বিধবার বুকে ক্রন্দন-শ্বাস, হা হুতাশ আমি হুতাশীর।
আমি বন্চিত ব্যথা পথবাসী চির গৃহহারা যত পথিকের,
আমি অবমানিতের মরম বেদনা, বিষ – জ্বালা, প্রিয় লান্চিত বুকে গতি ফের
আমি অভিমানী চির ক্ষুব্ধ হিয়ার কাতরতা, ব্যথা সুনিবিড়
চিত চুম্বন-চোর কম্পন আমি থর-থর-থর প্রথম প্রকাশ কুমারীর!
আমি গোপন-প্রিয়ার চকিত চাহনি, ছল-ক’রে দেখা অনুখন,
আমি চপল মেয়ের ভালোবাসা, তা’র কাঁকন-চুড়ির কন-কন!
আমি চির-শিশু, চির-কিশোর,
আমি যৌবন-ভীতু পল্লীবালার আঁচড় কাঁচলি নিচোর!
আমি উত্তর-বায়ু মলয়-অনিল উদাস পূরবী হাওয়া,
আমি পথিক-কবির গভীর রাগিণী, বেণু-বীণে গান গাওয়া।
আমি আকুল নিদাঘ-তিয়াসা, আমি রৌদ্র-রুদ্র রবি
আমি মরু-নির্ঝর ঝর ঝর, আমি শ্যামলিমা ছায়া-ছবি!
আমি তুরীয়ানন্দে ছুটে চলি, এ কি উন্মাদ আমি উন্মাদ!
আমি সহসা আমারে চিনেছি, আমার খুলিয়া গিয়াছে সব বাঁধ!

আমি উথ্থান, আমি পতন, আমি অচেতন-চিতে চেতন,
আমি বিশ্ব-তোরণে বৈজয়ন্তী, মানব-বিজয়-কেতন।
ছুটি ঝড়ের মতন করতালি দিয়া
স্বর্গ মর্ত্য-করতলে,
তাজী বোররাক আর উচ্চৈঃশ্রবা বাহন আমার
হিম্মত-হ্রেষা হেঁকে চলে!

আমি বসুধা-বক্ষে আগ্নিয়াদ্রি, বাড়ব-বহ্ণি, কালানল,
আমি পাতালে মাতাল অগ্নি-পাথার-কলরোল-কল-কোলাহল!
আমি তড়িতে চড়িয়া উড়ে চলি জোর তুড়ি দিয়া দিয়া লম্ফ,
আমি ত্রাস সন্চারি ভুবনে সহসা সন্চারি’ ভূমিকম্প।

ধরি বাসুকির ফণা জাপটি’ –
ধরি স্বর্গীয় দূত জিব্রাইলের আগুনের পাখা সাপটি’।
আমি দেব শিশু, আমি চঞ্চল,
আমি ধৃষ্ট, আমি দাঁত দিয়া ছিঁড়ি বিশ্ব মায়ের অন্চল!
আমি অর্ফিয়াসের বাঁশরী,
মহা- সিন্ধু উতলা ঘুমঘুম
ঘুম চুমু দিয়ে করি নিখিল বিশ্বে নিঝঝুম
মম বাঁশরীর তানে পাশরি’
আমি শ্যামের হাতের বাঁশরী।
আমি রুষে উঠি’ যবে ছুটি মহাকাশ ছাপিয়া,
ভয়ে সপ্ত নরক হাবিয়া দোজখ নিভে নিভে যায় কাঁপিয়া!
আমি বিদ্রোহ-বাহী নিখিল অখিল ব্যাপিয়া!

আমি শ্রাবণ-প্লাবন-বন্যা,
কভু ধরনীরে করি বরণীয়া, কভু বিপুল ধ্বংস-ধন্যা-
আমি ছিনিয়া আনিব বিষ্ণু-বক্ষ হইতে যুগল কন্যা!
আমি অন্যায়, আমি উল্কা, আমি শনি,
আমি ধূমকেতু-জ্বালা, বিষধর কাল-ফণী!
আমি ছিন্নমস্তা চন্ডী, আমি রণদা সর্বনাশী,
আমি জাহান্নামের আগুনে বসিয়া হাসি পুষ্পের হাসি!

আমি মৃন্ময়, আমি চিন্ময়,
আমি অজর অমর অক্ষয়, আমি অব্যয়।
আমি মানব দানব দেবতার ভয়,
বিশ্বের আমি চির-দুর্জয়,
জগদীশ্বর-ঈশ্বর আমি পুরুষোত্তম সত্য,
আমি তাথিয়া তাথিয়া মাথিয়া ফিরি স্বর্গ-পাতাল মর্ত্য!
আমি উন্মাদ, আমি উন্মাদ!!
আমি চিনেছি আমারে, আজিকে আমার খুলিয়া গিয়াছে সব বাঁধ!!

আমি পরশুরামের কঠোর কুঠার
নিঃক্ষত্রিয় করিব বিশ্ব, আনিব শান্তি শান্ত উদার!
আমি হল বলরাম-স্কন্ধে
আমি উপাড়ি’ ফেলিব অধীন বিশ্ব অবহেলে নব সৃষ্টির মহানন্দে।
মহা-বিদ্রোহী রণ ক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত,
যবে উত্‍পীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না –
অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না –
বিদ্রোহী রণ ক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত।

আমি বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান বুকে এঁকে দিই পদ-চিহ্ন,
আমি স্রষ্টা-সূদন, শোক-তাপ হানা খেয়ালী বিধির বক্ষ করিব ভিন্ন!
আমি বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান বুকে এঁকে দেবো পদ-চিহ্ন!
আমি খেয়ালী-বিধির বক্ষ করিব ভিন্ন!

আমি চির-বিদ্রোহী বীর –
বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি একা চির-উন্নত শির!
Read More...